‘রাজনৈতিক সরকার ছাড়া সংস্কার টেকসই হবে না’

দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের আবহ তৈরি করে আগস্টের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের আহŸান জানিয়ে বক্তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিষয়ে কাজ করলে ও সময় নিলে দেশে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল শনিবার খুলনা প্রেসক্লাবে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভার্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্কারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বিভাগে ধারাবাহিক সংলাপ করছে। 

সংলাপে অতিথি আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-কুয়েট’র ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাছুদ ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শেখ আব্দুল আজিজ। সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক জিল­ুর রহমানের সঞ্চালনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আইনজীবী, রাজনীতিক, শিল্প উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, আধিকার কর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী সংগঠক, সেচ্ছাসেবীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের পেশাজীবীরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সংস্কার বিষয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত জানান।
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাছুদ জানান, আমাদের অনেকের মধ্যেই এমন একটি কথার প্রচলন রয়েছে যে, এক স্বৈরাচারের পতনের পর আরেকটি স্বৈরাচারের আগমন ঘটতে যাচ্ছে, আমি এই কথার সাথে একমত নই। আমাদের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, এটি অব্যাহত রাখতে হবে। সংস্কারের কথা উলে­খ করে তিনি জানান, বিচার ব্যবস্থা ও নির্বাচন ব্যবস্থা এ দু’টি বিষয়ের আমাদের জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন, এর পরেই দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা উচিত।

প্রবীণ আইনজীবী শেখ আব্দুল আজিজ বলেন, স্বৈরাচারী সরকাররা সবসময়ই নিজেদের মতো করে আইন তৈরি করে এবং তা দিয়ে নিজেদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। আমাদেরকে এই ব্যবস্থা থেকে বের হতে হবে। পাশাপাশি, বিদ্যমান আইনকে যথাযথভাবে প্রয়োগও করতে হবে।

জিল­ুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে আমাদেরকে সব মতের মানুষকে কথা বলতে দিতে হবে। মানুষকে কথা বলতে না দিলে কী পরিণাম হয়, তা আমরা ৫ আগস্টের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি। এখন মানুষের মাঝে পরিবর্তন ও দেশ পুনর্গঠনের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে। এই আকাক্সক্ষাকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে দেশকে নতুন ভাবে গড়ে তুলতে হবে।

সংলাপে অংশ নিয়ে বিএনপি’র তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল জানান, দেশ পুনর্গঠনে বিএনপি ৩১ দফা দিয়েছে, আমাদের নেতা তারেক রহমান জানিয়েছেন এটি পরিবর্তনশীল এবং জাতীয় প্রয়োজনে সময়োপযোগী বিষয় এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আমরা মনে করি এর মধ্যদিয়েই গণতান্ত্রিক ও জনগণমুখী দেশ গঠন করা সম্ভব। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশকৃত ‘বহুত্ববাদ’ শব্দের সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যেই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে, এখানে বহুত্ববাদ অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন নেই।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বয়স ২১ বছর করাটি প্রশংসনীয় হলেও দশ শতাংশ তরুণের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশটি অনুচিত। তিনি জানান, ‘দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী একই ব্যক্তি হতে পারবে না’ - এটি বাস্তবতা বহির্ভূত সুপারিশ। আমাদের দেশের বিবেচনায় দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে এটি সম্ভব নয়।

বর্তমান সময়ের বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবীরা যা বলছেন তা শুনলে সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না। তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি আহŸান জানিয়ে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের আবহ তৈরি করে আগস্টের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করুন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিষয়ে কাজ করলে ও সময় নিলে দেশে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা রয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধি জানান, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে সবার আগে ’৭২-এর সংবিধানকে বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে এবং ২৪-কে ধারণ করে বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে হবে।

একজন নারী উদ্যোক্তা আহŸান জানান, সংস্কার করতে গিয়ে যেন নারীদের জন্য জায়গাটি আরও ছোট না হয়, সেটি সবাই খেয়াল রাখবেন। নারীরা অনেক দূর এগিয়েছে, নতুন বাংলাদেশে তা থেকে যেন পিছিয়ে না যায়, আপনারা সবাই সেদিকে মনোযোগ দেবেন।

দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এক প্রতিনিধি জানান, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকারকে মূল্যায়ন না করলে কোনো ধরনের উন্নয়ন বা সংস্কারই টেকসই হবে না। দেশ পুনর্গঠনে অবশ্যই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি বলেন, বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করার জন্য সংস্কার করা প্রয়োজন। আইন এবং বিচার ব্যবস্থার মধ্যে অনেক ফাঁক আছে, যা কিনা ৫ আগস্টের পর থেকে দৃশ্যমান। ইসলামী ছাত্র আন্দোলন সব সময় আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের কথা বলে যাচ্ছে। কেননা, এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের প্রতিনিধি বলেন, গণতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার একসাথে চলতে পারে না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি দরকার সবচেয়ে বেশি। তিনি আরও জানান, অবশ্যই মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধান সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধান শাসকগোষ্ঠীকে শাসন করবে, শাসনতন্ত্র সংবিধানকে শাসন করবে না।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)- সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) বাংলাদেশ ভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক যা সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে গবেষণা ও মিডিয়া স্টাডি পরিচালনা করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো শিক্ষাগত স¤প্রদায়, সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে শাসনের মান উন্নত করা, বাংলাদেশের নিরাপত্তার চাহিদা পূরণ করা, দারিদ্র্য নিরসনের জন্য উপলব্ধ সম্পদের দক্ষ ও বিচক্ষণ ব্যবহার করার শর্ত তৈরি করা, মানব সম্পদ উন্নয়ন, এবং বর্ধিত গণতন্ত্রিকরণ, অংশগ্রহণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা।

News Courtesy:

‘রাজনৈতিক সরকার ছাড়া সংস্কার টেকসই হবে না’ /title> <meta property="og:image" content="https://assabuj.com/skhobor/logo/logo.png" /> <!DOCTYPE html> <html lang="en"> <head> <meta charset="UTF-8"> <meta name="viewport" content="width=device-width, initial-scale=1.0"> <title>সময়ের খবর

 

Comments