সাংবিধানিক পদে নিয়োগের পদ্ধতি বদলাতে হবে
বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। দলবাজ, পক্ষপাতদুষ্ট, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে—এ ধরনের ব্যক্তিদের সাংবিধানিক বিভিন্ন পদে বসানো হয়েছিল। গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার কর্তৃপক্ষ বদলাতে হবে। এর একটা সমাধান হতে পারে সাংবিধানিক বিভিন্ন পদে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা। তবে রাষ্ট্রপতি যাতে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকতে পারবেন।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সংলাপে বিশিষ্টজনদের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকার রমনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ মিলনায়তনে এই সংলাপের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্কারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে দেশের সব বিভাগে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ’ শিরোনামে ধারাবাহিক সংলাপ করছে তারা। এদিনের বিষয় ছিল ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান’।
মানুষ শুধু শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করতেই রাস্তায় নামেনি, শেখ হাসিনা যা কিছুর প্রতিনিধিত্ব করেছেন, সেই সবকিছুরও বাতিল চেয়েছে।
বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান
সংলাপে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শেখ হাসিনা ছিল কর্তৃত্ববাদের একটা প্রতীক। মানুষ শুধু শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করতেই রাস্তায় নামেনি, শেখ হাসিনা যা কিছুর প্রতিনিধিত্ব করেছেন, সেই সবকিছুরও বাতিল চেয়েছেন। দলবাজ, পক্ষপাতদুষ্ট, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে—এমন ব্যক্তিদের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এর একটা বড় উদাহরণ ছিল নির্বাচন কমিশন। গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন করতে হলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপদ্ধতি বদলাতে হবে।
নির্বাচন কমিশন নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ বলে উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যয় যাতে দায়যুক্ত হয়, সেই সুপারিশ তাঁরা করেছেন। সংসদের উচ্চকক্ষে সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির কাছে নির্বাচন কমিশনকে দায়বদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার পরও কারও বিরুদ্ধে অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠলে যাতে প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকে, সেই প্রস্তাবও করা হয়েছে।
সংলাপে সাবেক কূটনীতিক এম শফিউল্লাহ বলেন, বিগত সময়ে দেখা গেছে রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ দিতেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে হবে। তাহলে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকতে পারবেন। সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে পৃথক ব্যালটেই এটি হতে পারে। সাংবিধানিক বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
পুলিশ ভেরিফিকেশনে (যাচাই) দলীয় পরিচয় কেন আসবে, সেই প্রশ্ন তোলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ। গত ১৫ বছরে মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয় কেন ব্যাংক ধ্বংসের বিষয়টি দেখেনি সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন হতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করতে হবে।
‘দৃশ্যমান উন্নতি না হলে ব্যর্থতার দায় পড়বে’
সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলুক, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যমান কিছু উন্নতি বা পদক্ষেপ দেখাতে না পারলে ব্যর্থতার দায় নিয়েই তাদের চলে যেতে হবে বলে সংলাপে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিত্যনৈমিত্তিক কাজে সমন্বয়ের অভাব রয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতিও রয়েছে। সংস্কারপ্রক্রিয়া চলুক, পাশাপাশি সরকারকে দৈনন্দিন বিষয়েও মনোযোগ দিতে হবে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, সংস্কার করতে গেলে একটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সংস্কৃতির পরিবর্তন তো সময়সাপেক্ষ বিষয়। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে। কিন্তু সংস্কার করে তারপর নির্বাচন, সেটা একেবারেই সম্ভব নয় এবং এটা বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ, সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া।
এই মুহূর্তে দেশে ব্যাপক বিনিয়োগ দরকার বলে উল্লেখ করেন রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি ‘বিনিয়োগ মডেল’ তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা ঠিক করে দেশে সঠিক শাসন আনতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আইনের শাসন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, অনিয়ম-অনাচার-চাঁদাবাজি চলছে। যে কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। অ্যাটর্নি জেনারেল পদে বিএনপি নেতা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এবি পার্টির নেতাকে নিয়োগ দেওয়ার সমালোচনা করেন তিনি।
একতরফা ঘোষণাপত্র, অমুক দাবি, তমুক দাবি—এসবে গা ভাসিয়ে না দেওয়ায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ জানান বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি সংলাপে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সবাইকে নিয়ে পথচলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যতটুকু ঐকমত্য রাজনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে কাজ করে, ততটুকুই কার্যকর। অস্পষ্টতা নিয়ে নীতিনির্ধারণ করা যাবে না। এই জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপি সজাগ।
টেকসই সংস্কার করতে হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে বলে সংলাপে উল্লেখ করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া কাঠামোটা বহাল তবিয়তে আছে। তাই কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার কর্তৃপক্ষ বদলাতে হবে। এই নিয়োগগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে কনসেনসাস (ঐকমত্য) তৈরি হতে হবে।
সংলাপে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, সবকিছু ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তোলা দরকার। এর জন্য দরকার সম্মিলিত উপলব্ধি। গণতন্ত্র থাকলে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা আলাদাভাবে থাকার প্রয়োজন নেই। গণতন্ত্র থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা এমনিতেই থাকবে।
মানসিকতার পরিবর্তন দরকার
উচ্চ আদালতের বিচারকদের দিয়ে ‘সার্চ কমিটি’ গঠন নিয়ে সংলাপে প্রশ্ন তোলেন সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বিচারকদের এ ধরনের দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। ‘সিটিং’ (বর্তমানে দায়িত্বে থাকা) বিচারকদের দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন সঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংলাপে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, পরিবর্তন হতে হবে মনোজগতে। আইন যারা বানায় ও প্রয়োগ করে, তারা যদি আইন ভাঙা শুরু করে, তাহলে আর আইনের প্রয়োগ হয় না। তাই আগে মাথা ঠিক করতে হবে। তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টাদের কেউ কেউ সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ নেওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে বলছেন সংবিধান মানি না। তাহলে একজন রিকশাচালক কেন আইন মানবেন?’
গায়ের জোরে ঘাড় ধরে কিছু চাপিয়ে দিলে তা টেকসই হবে না বলে উল্লেখ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, দেশে প্রতিষ্ঠানই তৈরি হয়নি। তাই ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ এবং অনেক শোরগোলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে না, মন্ত্রণালয়গুলোর এ ধরনের মানসিকতা এখনো রয়ে গেছে বলে মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং।
সংলাপে সঞ্চালক ছিলেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান। সমাপনী বক্তব্য দেন সিজিএসের চেয়ারপারসন মুনিরা খান। সংলাপে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান, এম এ আজিজ ও আবু সাঈদ খান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক পারভেজ করিম আব্বাসী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুনমুন মাহজাবিন ও মুহাম্মদ খালিদ খান।
News Courtesy:
সাংবিধানিক পদে নিয়োগের পদ্ধতি বদলাতে হবে | প্রথম আলো