সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংস্কার চালু রাখার দাবি

সংস্কারের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

তিনি বলেন, সংস্কার নিয়ে আলাপ চলুক, উন্নতি না দেখাতে পারলে অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থতার দায় নিতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজন ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ: সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গ’ অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ মিলনায়তনে এটি অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপটি পরিচালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। জুলাই-আগস্ট আন্দোলন হয়েছে অর্থনীতির জন্য, চাকরির জন্য। সংস্কার করে পরে ক্ষমতা হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে স্বস্তি আনতে হবে। তাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম চালু রাখাই অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য হতে পারে।

তিনি বলেন, আমাদের বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। বছরের পর বছর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নষ্ট করে দিয়েছে। এত সংস্কার করার পর নির্বাচিত সরকার যদি তা না মেনে নেয় তাহলে জনগণ আবার অসহায় হয়ে পড়বে। আমাদের তথ্যের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন চুক্তির তথ্য আমরা জানি না। বর্তমান সরকার যদি উন্নতি না দেখাতে পারে, তাহলে তাদের ব্যর্থতা নিয়ে চলে যেতে হবে। বিদ্যুৎ ক্রয়ের যে চুক্তিগুলো ছিল, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে; কিন্তু তারা তা করেনি। আমাদের এই মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। যারা উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন তাদের সদিচ্ছা থাকলেও প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য হয়তো পারেননি। কারণ প্রশাসনে আগের কাঠামো রয়ে গেছে।

সংলাপের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, সংস্কার শব্দটি ঘৃণিত শব্দে পরিণত হয়েছে। সংস্কার জরুরি। সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ গত ৫৩ বছরে প্রতিষ্ঠানকে ঠিক করতে পারেনি। আমাদের আগে নজর দিতে হবে সঠিক ব্যবস্থা করার। নেতা ভুল করতে পারে কিন্তু সিস্টেম ঠিক থাকলে শুধরানোর সুযোগ থাকে।

সুজন সম্পাদক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা সংসদে ১০০টি আসন সংরক্ষিত নারীদের জন্য বরাদ্দ করার প্রস্তাবনা দিয়েছি, যেন নারীরা বৈষম্যের স্বীকার না হয়। নারীরা যদি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকে, তাহলে বৈষম্য কমে আসবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তা ত্রুটিপূর্ণ। এজন্যই নিয়মকানুন ও সংস্কার দরকার এবং নতুন আইনের খসড়া দরকার। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হওয়ার কথা কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এটি নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন করতে হলে নিয়োগ পদ্ধতি বদলাতে হবে, আইনকানুন পরিবর্তন করতে হবে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। নির্বাচন সংক্রান্ত আইনগুলো অধ্যাদেশ আকারে জারি করে কার্যক্রম যত দ্রুত শুরু করা যায়, তত দ্রুত নির্বাচন হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, স্ব-বিরোধিতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ নিয়মতান্ত্রিক হতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে হবে। ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সাবেক কূটনৈতিক এম শফিউল্লাহ বলেন, বিগত বছরে আমরা দেখেছি প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রপতিকে জনগণ নিয়োগ দিলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন বা সামগ্রিক পুনর্গঠনের ক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়ে থাকলে ওই ক্ষমতা যথাযথ চর্চা হচ্ছে কি না, সরকারের টার্মস অব রেফারেন্স কতটুকু, সে ব্যাপারে স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে ঐকমত্য আছে কি না, এ বিষয়গুলো পরিষ্কার না হলে অনেক আলোচনা পণ্ড হয়ে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ক্যাডার বলে যারা পরিচিত, তাদের মধ্যে অনেকেই পাবলিক সার্ভিস কমিশনে নিয়োজিত। এই লিগ্যাসি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও পরোক্ষভাবে দেখতে পাচ্ছি। সেজন্য একটি কমিশন করে স্টেট উইদিন অ্যাক্টরদের মধ্যে এই ব্যত্যয়গুলো তুলে ধরা দরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি মেম্বার ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, সংস্কার জনগণের ভেতরে থাকলে কোনো রাজনৈতিক দল সেই সংস্কারবাদ বা বিরোধী হতে পারবে না।

সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, পরিবর্তন হতে হবে মনস্তাত্ত্বিক জগতে। আইন যারা বানায় তারাই যদি আইন ভাঙে তাহলে সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ হয় না। সরকার শপথ নেওয়ার সময় বলে সংবিধান মেনে চলবে কিন্তু ১০ মিনিট পরেই বলে যে সে সংবিধান মানে না।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ৫৩ বছরে আমাদের সংবিধান ১৭ বার পরিবর্তন হয়েছে। ২৫০ বছরে আমারিকায় সংবিধানে তেমন পরিবর্তন আসেনি। সব কিছু ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তোলা দরকার। এ জন্য দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। দুবারের বেশি কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারবে না, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এরকম কিছু পরিবর্তন দরকার।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রস্তাবনার কিছু বিষয়ের সঙ্গে আমরা একমত। নির্বাচন লাগবে সংস্কার করার জন্য। বাংলাদেশে এখন সিস্টেম তৈরি করতে হবে, রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জনগণের জন্য তৈরি করা। বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে ঐকমত্য থাকতে হবে।

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, মানুষ পরিবর্তন না হলে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন হবে না। আবার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন না হলে মানুষ পরিবর্তন হবে না। শেখ হাসিনা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাধা দিয়েছে তাই তার পতন হয়েছে।

News Courtesy:

সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংস্কার চালু রাখার দাবি | কালবেলা

 

Comments